Posted By:
boibd
পার্পেচুয়াল আতঙ্ক - মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম Perpetual Atongko by Mahammad Saiful Islam
পার্পেচুয়াল আতঙ্ক
মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম
প্রকাশনীঃ বাতিঘর প্রকাশনী
প্রচ্ছদঃ বাপ্পী খান
প্রথম প্রকাশঃ অমর একুশে বইমেলা ২০২৩
পৃষ্ঠা : ২২৫
মুদ্রিত মূল্যঃ ৩৬০৳
ব্যাক্তিগত রেটিং : ৯/১০
লেখকের বড্ড প্রেমে পড়ে গেলাম আবার। আবার কেন? কারণ ঐ যে 'লোলার জগৎ'। লোলার জগৎ পড়ার পর এবছর বই কেনার তালিকায় সবার আগে স্থান পেয়েছিল এই 'পার্পেচুয়াল আতঙ্ক' । প্রচুর কল্পবিজ্ঞান পড়া হলেও অভিনব প্লট খুব কমই থাকে তার মধ্যে। কিন্তু সাইফূল ইসলাম ভাই, রীতিমত কাপিয়ে দিয়েছেন তার এই অভিনব, মৌলিক মনোমুগ্ধকর প্লট স্থাপন করে। অভিনব হলেও মজার ব্যপার তিনি কিন্তু প্রচলিত বিজ্ঞানের ব্যাত্বয় ঘটাননি এখানে। আর বিজ্ঞানটাকে তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন এটা ডালভাত। বিজ্ঞান না জানলেও তরতরিয়ে পড়ে ফেলতে পারবেন আপনি।
এবার আসি গল্প নিয়ে। বইটিতে গল্পের দুটো টাইমলাইন আছে। যেটা এক পরিচ্ছেদ পরপর সমান তালে এগিয়ে গেছে। চলুন সেই দুটো টাইমলাইনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই।
আকাশছোঁয়া এক দেয়ালের ভেতর শত শত বছর ধরে বন্দী হয়ে আছে একটি জনপদ। এই দেয়ালটিকে তারা মনে করে তাদের ঈশ্বর। তারা মনে করে এই দেওয়ালের অপর পাশে আছে দৈত্য, দানো। তারা বিশ্বাস করে এই দেওয়াল-ঈশ্বর তাদেরকে নিরাপদ রাখে এবং রাখছে। তাই দেওয়ালকে রীতিমত পুজো করে তারা। দেওয়ালের ওপাশে যাওয়ার চিন্তা মানেই ঈশ্বরের বিরোধীতা করা, শয়তানকেই অনুসরণ করা। পুরোহিতরাও তাদের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে প্রটেক্ট করে যাতে এই জনগোষ্ঠীর কেউ ওই দেওয়াল পার হয়ে যেতে না পারে। কিন্তু এক তরুণ ছেলে 'রুমি', সে পুরোহিতদের এসব গালগপ্প একদম বিশ্বাস করে না। সে জানতে চায় দেওয়ালের ওপাশে কি আছে! সে মনে করে তাদেরকে একটা দেওয়ালের ভেতর বন্দী করে রাখা হয়েছে। এবং এটা নিশ্চয়ই কারো একজনের পূর্বপরিকল্পিত।
অপর টাইমলাইনে পাবেন আমাদের মহান বিজ্ঞানী প্যানহাল কোহেন কে। তিনি তার যুগের চেয়েও এগিয়ে থাকা জ্ঞান আর বিজ্ঞানশক্তি দিয়ে বানিয়ে ফেলেছেন আজীবনের আকাঙ্ক্ষিত 'পার্পেচুয়াল ইঞ্জিন'। যা দিয়ে আমরা পেতে পারি জ্বালানিবিহীন নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ শক্তি। যার মাধ্যমে নিমেষেই সমাধান হয়ে যায় সভ্যতার জটিল সব সমস্যার। পরিবেশ দূষণ থাকবে না, দৈহিক পরিশ্রম কমে আসবে অনেকাংশে, অসুস্থ প্রতিযোগিতা থাকবে না ফলে মানুষ সৃজনশীল সব কাজে মনোনিবেশ করতে পারবেন। কিন্তু প্রশ্ন একটা থেকেই যায় সবার মনে। তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্রানুসারে শক্তির বিনাস কিংবা সৃষ্টি নেই, শক্তি কেবল একরূপ থেকে আরেক রূপ ধারণ করে মাত্র। তাহলে কিভাবে তিনি এটি সম্ভব করলেন? অথচ তিনি কিন্তু থার্মোডাইনামিক্সের সূত্রের ব্যত্যয় না ঘটিয়েই সভ্যতার এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি করে ফেলেছেন। এবং তৈরির কৌশল রেখেছেন সবার অগোচরে। কিন্তু তিনি এর সাইড এফেক্ট সম্পর্কেও অবগত ছিলেন।
তার মতে ঠিক চার পাচশ বছর পর এই ইঞ্জিনগুলো ধ্বংস করে দিতে হবে। নাহলে পৃথিবী পতিত হবে নিশ্চিত ধ্বংসের মুখে। আর এই ইঞ্জিনগুলো ধ্বংস করার সম্পূর্ণ নীল নকশাও তিনি তৈরি করেন। কেননা সাধারণ কোন কৌশলে এটা ধ্বংস করা যাবে না। ধ্বংস করলে চেইন রিয়াকশনের মাধ্যমে পৃথিবী সেই ধ্বংসের মূখেই পতিত হবে। আর এজন্য ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ তিনজন ব্যক্তির জন্যও তিনটা গোপন বার্তাও রেখে যান।
এটা মাত্র গল্পের শুরু। এরপর একদিকে চলতে থাকে ডানপিটে বিজ্ঞানমনষ্ক রুমির গোপন পরিকল্পনা, কিভাবে দেওয়াল টপকানো যায়। অপরদিকে দেখতে পাওয়া যায় পার্পেচুয়াল ইঞ্জিনের সুফল ও কুফল দিকগুলো। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে একের পর এক রহস্য। আসতে থাকে নতুন নতুন সব চরিত্র। বিশেষ করে শ্যাপা আর বহ্নি দুই বিপরীত মেরুর দুইজন চরিত্রকেও ভালোবেসে ফেলতে পারেন।
সব মিলিয়ে আমার অসম্ভব ভালো লেগেছে বইটা। বই সম্পর্কে আরো গভীরে যাওয়া মানেই স্পয়লার দেওয়া। সেটা আমার একদম পছন্দ না।
এখন প্রশ্ন বইটির কমতি কি ছিল? আমার কাছে সেটার পরিমাণ খুব কম। শেষ অংশটা রোলারকোস্টারের মতো মারাত্মক দ্রুত এগিয়েছে। আরেকটু রহে সহে হলে বেশি উপভোগ্য হতো। এই তাড়াহুড়োইটুকুই যা কমতি। টাইমলাইনের সময়কালটা উল্লেখ করলে পাঠকদের একটু বুঝতে সুবিধা হতো। তবে আমার কাছে এটা খানিকটা টুইস্টের মতোই লেগেছে। আর দু একটা বানান ভুল আমি কখনোই ধর্তব্যের মধ্যেই নি না। কেননা ওটা সম্পাদনার অংশ। গল্পে এফেক্ট পড়ে না।
আপনাদের জন্য নিচে কিছু ছবি সংযুক্ত করলাম। যেগুলো মিডজার্নি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে তৈরি করা। তৈরি করেছেন সাজ্জাদ হোসেন ভাই। সামান্য স্পয়লার যুক্ত হলেও গল্পে আপনার আগ্রহ বাড়বে। আমার ভীষণ পছন্দ হয়ছে ছবিগুলো।
সবিশেষ, প্রিয় পাঠকগন। আপনাদেরকে যদি বইটির প্রতি কৌতুহল জাগাতে পারি তবেই আমার এই রিভিউ সার্থক। কেমন লাগলো জানাবেন।।
রিভিউটি লিখেছেনঃ Aishu Rehman
আপনিও লিখতে পারেন রিভিউ। বিস্তারিত দেখুন এখানে।
Posted By:
boibd
আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে || কিশোর পাশা ইমন Amra Tomar Shantipriyo Shanta Chele by Kishor pasha Emon
আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে
কিশোর পাশা ইমন
নালন্দা প্রকাশনী
প্রকাশকালঃ ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩
পৃষ্ঠাঃ ৩৯০
মুদ্রিত মুল্যঃ ৮৫০ টাকা
প্রচ্ছদঃ সজল চৌধুরী
কলকাতায় পরিবেশকঃ বইবাংলা, কলেজ স্ট্রিট
ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৯/১০*
ক্রয় করার পূর্বে জল্পনা কল্পনাঃ
জীবনে অনেক বই কিনে ঠকেছি। ভবিষ্যতে আরো হয়তো ঠকবো। কিন্তু কখনো ঠকিনি যাদের বই কিনে তাদের মধ্যে অন্যতম কেপি ইমন। তার প্রত্যেকটা বই নিয়ে থাকে অনেক জল্পনা কল্পনা। তাই প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই নিজের কপিটা সোজা বোগলদাবা করে ফেলি। তার বইয়ের প্রতি যে অমোঘ আকর্ষণ এটা কিন্তু একদিনে তৈরি হয় নি। 'যে হীরকখন্ডে ঘুমিয়ে কুকুরদল', 'মৃগতৃষা', 'জাদুঘর সিরিজ', 'ছারপোকা দ্য ব্যাটেল অব মাহেন্দ্রপুর' , 'ডিসটোপিয়া' এরকম বেশ কটি দুর্দান্ত লেখায় এই আকর্ষণের মুল ভিত্তি।
বইটির প্রতি একটু বেশিই আগ্রহীঃ
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কম বই পড়িনি জীবনে। বাজারে আছে ভুরি ভুরি। কিন্তু তার অধিকাংশই অতিরঞ্জিত কিংবা অতিনাটকিয়তায় মোড়া। কেপির প্রতি আলাদা আস্থা থেকে আঁচ করছিলাম, এবার হয়তো মোক্ষম কিছু পেতে যাচ্ছি। বিশেষ করে স্রেফ সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ আর ক্র্যাক প্লাটুনকে নিয়ে আস্ত একটা নন-ফিকশন এই বৈশিষ্ট্যটুকুই বইপ্রেমীকে আকৃষ্ট করতে বাধ্য।
সম্পূর্ণ বইটির সাথে ভ্রমণের অভিজ্ঞতাঃ
বইটির প্রথমেই লেখকের মুখবন্ধ পাবেন। যেখানে তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, 'তিনি প্রত্যেক বীরশ্রেষ্ঠকে মানবীয় রুপেই চিনিয়েছেন। অতিরঞ্জিত কিংবা অতি ভক্তির স্থান শুন্য। দেখিয়েছেন মানবরুপে' । শুধুমাত্র দায়িত্ববোধ থেকে, দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকে, বৃহত্তর স্বার্থে দলের জন্যে যেটুকু করেছেন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে, সেটুকুই ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পীর নিখুঁত তুলিতে।
পড়ার সময় মনে হচ্ছিল, আমি এসব সূর্যসন্তানদের সাথে সাথেই হাঁটছি। তাদের প্রত্যেকটা পদক্ষেপ অবলোকন করছি। তাদের বুদ্ধি, চিন্তাভাবনা, সাহস আর নির্ভীকতার সাক্ষী থাকছি। কখনো অবাক হচ্ছি। যেন শিরদাড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে যাচ্ছে। কখনো বিষাদের কালো ছায়ায় নিমজ্জিত হচ্ছি। চোখের কোণে জমা হচ্ছে বিন্দু বিন্দু বাষ্প। এটা হবে আমি জানতাম, কেননা এই ৭১ জিনিসটা আমার কাছে চিরকালের আবেগের বস্তু। আর এই আবেগটাকে আরো শতগুন বাড়িয়ে দিয়েছে লেখকের লেখার মুন্সিয়ানা।
বইটির ঘটনাপ্রবাহ মুক্তিযুদ্ধের টাইমলাইন ধরেই এগিয়েছে। ন্যারেটিভ স্টাইলে। তাই বোরিং হওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ এবং ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যদের পেছনের গল্প, যুদ্ধের মোটিভেশন, যুদ্ধকালীন ট্রমা এসব থেকে একজন অকুতোভয় সাহসী যোদ্ধা হয়ে উঠার গল্প সবকিছুই ছিল মারাত্মক রকমের সুন্দর ও নিখুঁত। লেখক তার সবকিছুই ঢেলে দিয়েছেন বলতে গেলে। যুদ্ধের প্রতিটা লোকেশনের ডিটেইলিং, অস্ত্র-গোলাবারুদ এবং যুদ্ধবিমানের খুঁটিনাটিসহ ছোট খাট সবকিছুই আপনাকে পড়ার সুখটা বাড়িয়ে দেবে বহুগুন।
বীরশ্রেষ্ঠ আর ক্রাক প্লাটুনের প্রত্যেকটা সদস্য নিয়েই একটা করে অনুচ্ছেদ লেখা যায়। কিন্তু আমি সেদিকে যাব না। আমরা প্রত্যেকেই জানি তাদের জীবনে কি ঘটেছিল। কিন্তু কিভাবে ঘটেছিল তার নিখুঁত বিবরণটুকু জানতে হলেও আপনাকে হাতে তুলে নিতে হবে এই বইটি।
আমন্ত্রণঃ
সাত বীরশ্রেষ্ঠকে খুব কাছ থেকে দেখার, বোঝার ও অনুভব করার এমন সুযোগ বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য এর আগে কখনো আসেনি। কিশোর রিক্রুট হামিদুর রহমানের উত্থান আপনি যদি তাঁর পায়ে হেঁটে দেখতে চান, অনুভব করতে চান হাসিখুশি তরুণ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের বদলে যাওয়া এক পাষাণ হৃদয় যোদ্ধায়, কিংবা একই ককপিটে বসে দেখতে চান ধীর-স্থির মতিউর রহমানের চারশো নট গতিতে উড়ে যাওয়া তাহলে -- এই বইটি একান্তই আপনার জন্য।
মোট কথাঃ
লেখক সফল। মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা এই অসামান্য বইটি লেখককে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ও হ্যাঁ, বইটির শেষ আপনাকে চরমভাবে আঘাত করতে পারে, কিছু তিক্ত সত্যতার মুখোমুখির মাধ্যমে।
স্বাধীনতার মাসে এমন একটা বই পড়তে পারা সৌভাগ্যের ব্যাপার বইকি। আজ স্বাধীনতা দিবস। আপাতত রিভিউ দিলাম। ভবিষ্যতে আস্ত বইটা নিয়েই হাজির হব এখানে।
রিভিউটি লিখেছেনঃ Aishu Rehman
আপনিও লিখতে পারেন রিভিউ। বিস্তারিত দেখুন এখানে।
Posted By:
boibd
উধোতকাণি চিত্তাণি- সুতপা বসু Udhotkani Chittani - Sutapa Basu
বই- উধোতকাণি চিত্তাণি
লেখিকা– সুতপা বসু
প্রকাশক– আনন্দ পাবলিশার্স
প্রথম প্রকাশ– ডিসেম্বর ২০২২
প্রচ্ছদ শিল্পী- সুব্রত চৌধুরী
পৃষ্ঠা– ২০৮
মুদ্রিত মূল্য– ₹ ৫৫০/-
উধোতকাণি চিত্তাণি অর্থাৎ আলোকপ্রাপ্ত মন
এ গদ্যের সময়কাল ১৯৩২ থেকে ১৯৪৬। সুদূর তিব্বতের কোনও এক রাজার রাজ্য। বয়স্ক রাজার ক্ষমতাশালিনী দ্বিতীয় স্ত্রী যিনি বর্তমানে রাজ্যের হাল ধরে আছেন, রাজার সাথে এক সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ কন্যাসমা সামতেনের বিয়ে দিতে উদ্যত। যে বিবাহ প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতা বজায় রাখার এক চাল ভিন্ন অন্য কিছুই নয়। রাজার প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর তাঁর একমাত্র অবহেলিত কন্যা ইয়োনতেন আজ উচ্ছৃঙ্খল, উদ্ধত, নেশায় আশক্ত, উদ্দাম যৌনতায় মত্ত এক যুবতী রাজকুমারী । রাজ্যের দুই প্রান্তে দুই বৌদ্ধ সংঘ। যারা রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে আভ্যন্তরীণভাবে যুক্ত। তাঁদের গতিবিধির উপর রাজার ক্ষমতা – অক্ষমতা নির্ভরশীল।
রাজ্যের উত্তর ও পশ্চিমপ্রান্তের দুই মঠের দুই ক্ষমতাশালী সন্ন্যাসী - লোবসাং ও ইয়েশে। যাদের জীবন কাহিনীর বৈপরীত্য তাঁদের স্বভাবগতভাবেও বিপরীত মতির করে তুলেছিল, তাঁরা নিজ নিজ মতানুযায়ী রাজ্য তথা মঠের মঙ্গলকামনার্থে ক্ষমতাশালী হওয়ার অভিপ্রায়ে সন্ন্যাসীর সর্বত্যাগী আচার ভুলে কূটনৈতিক খেলা খেলতে বাধ্য হন। এবং জড়িয়ে পড়েন রাজনৈতিক দুর্বিপাকে।
রাজ্যের এক দরিদ্র কামার জিনপা। বিধবা মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে স্বল্প আয় সম্বল করে জীবনের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় রাজকুমারীর অন্দরমহলে তাকে হাজির করানো হয়। বিস্ময়ে হতবাক কামার যখন রাজকুমারীর অভূতপূর্ব রূপ ও বিলাস ব্যাসনে হতবাক, তখন রাজকুমারী এক অদ্ভুত আদেশ করেন। গড়ে দিতে হবে গয়না। কিন্তু কামার কেন গয়না গড়বে সুবর্ণকার থাকা সত্ত্বেও? কারণ গয়নার মোড়কে গড়তে হবে ধারালো গোপন অস্ত্র। কিন্তু কেন এমন গয়নারূপী অস্ত্র প্রয়োজন রাজকুমারীর? গয়না গড়ার সময়কালে রাজকুমারীর প্রেমজনিত ছেলেখেলার পাত্রে পরিণত সুদর্শন কামার ভুলে যায় নিজের সামাজিক অবস্থান। সমর্পণ করে নিজেকে। জড়িয়ে পড়ে রাজপ্রাসাদের এক গোপন গভীর ষড়যন্ত্রে। শেষ অবধি কি হয় জিনপার?
এক ছোট্ট শিশু দাচেন। যাকে প্রধান বৌদ্ধ মঠের পক্ষ থেকে উত্তরাধিকারী রূপে নির্বাচিত করা হয়েছে, মায়ের থেকে দুরে সরিয়ে মঠে রেখে কঠোর বৌদ্ধ ধর্মীয় সন্ন্যাস জীবনে অভ্যস্ত করানো হচ্ছে, সে পালিয়ে যেতে চায় মঠ থেকে। অথচ ক্ষমতা লোভীরা তার ক্ষণস্থায়ী সময়কালেই তাকে প্রাণে মারার চেষ্টা করে বারংবার। কি ভাবে কার দয়ায় কিংবা কার দুরদরশিতায় সে বেঁচে যায়? কিই বা হয় তার পরবর্তী জীবনরেখা।
এই সমস্ত চরিত্রর তৈরি করা গোলকধাঁধায় জটিল পঙ্কের ন্যায় জড়িয়ে যায় রাজপ্রাসাদের অলিন্দের ক্ষমতার লালসা, চিনা সৈন্যবাহিনী, বৌদ্ধ মঠ, রাজ্যের যৌথ কমিশন এবং জিনপার স্ত্রী পেমা, রানি সামতেন, দুটি গর্ভস্থ শিশু এবং আরও অনেকে। সমগ্র কাহিনী জুড়ে লোভ, লালসা, যৌন ঈর্ষা, প্রেম, মমতা, ত্যাগ সহ ভিন্ন ভিন্ন মানব অনুভূতির সমাহারে কাহিনী নিজ সমাপ্তি খুঁজে নেয়। কিংবা হয়ত সমাপ্তির পথে অগ্রসর হয়।
লেখিকা সুতপা বসুর লেখা এর আগে পড়ার সুযোগ হয়নি। ২০২২ সালে দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে এই আখ্যানটি প্রকাশিত হয়েছিল। রোমাঞ্চ ঘরানার বই রূপেই এর আত্মপ্রকাশ ঘটে ২০২৩ -এ। লেখার গতি সাবলীল। প্রায় নব্বই বছর পূর্বের ঘটনাকাল বজায় রাখার তাগিদে অযথা জটিল ভাষা ব্যবহৃত হয়নি বলে পড়তে বা বুঝতে অসুবিধা হয় না। আনন্দ প্রকাশনীর বইয়ের গুণগত মান নিয়ে আঙুল তোলার দুঃসাহস নির্বোধও করবেন না। যদিও নতুন বই পড়তে শুরু করে জানতে পারি অন্তত ১৫ টি পৃষ্ঠা ছেঁড়া ও মোড়ানো। কিন্তু তখন আর পাল্টানোর উপায় নেই। ফলত দুঃখের সাথেই বই পড়া শুরু।
এক বিন্দুও দ্বিধা না রেখে বলতে পারি ২০০ পৃষ্ঠা বইয়ে প্রকৃত কাহিনী খুব বেশি হলে ৭০ পৃষ্ঠার হবে। বাকি শুধুই প্রাকৃতিক বিবরণ, লেখিকার নিজস্ব দার্শনিক মতামত, চরিত্রদের দৃষ্টিকোণ দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন আনুষঙ্গিকে তাঁদের দার্শনিক চিন্তা ভাবনার প্রকাশ। সাথে জুড়ে যায় বৌদ্ধ ধর্মীয় অনুশাসনের বিভিন্ন কার্যকলাপ, মঠের নিয়ম নীতির বিস্তারিত বিবরণ। শুরুর দিকে এই ধরণের বর্ণনা পড়তে ভালো লাগলেও ধীরে ধীরে তা একঘেয়েমি ও শেষে বিরক্তি উৎপাদন করে। ফলে পড়ার গতিও রোধ হয়।
২০০ পৃষ্ঠার বই পড়তে আমার মত সাধারণ পাঠকের দুই থেকে তিনদিন লাগে। এই বইটি আমি প্রায় ১০ দিন ধরে শেষ করলাম। শুধুমাত্র বেশ মোটা অঙ্কের কষ্টার্জিত অর্থ খরচ করে বইটি কিনেছি বলেই শেষ করতে বাধ্য হলাম খানিকটা। নাহলে হয়ত মাঝ পথেই থেমে যেতাম।
উপরন্তু সমগ্র কাহিনী পড়ার পর বোঝা যায় বেশ কিছু প্রসঙ্গের উত্থাপন অকারণেই করা হয়েছিল। যার সাথে মূল কাহিনীর যোগাযোগ অত্যন্ত ক্ষীণ, কিছু ক্ষেত্রে প্রায় নেই বললেই হয়।
বইয়ে এত বিবরণের পর যখন সমাপ্তি আসে, তখন শেষের ৫-৭ পৃষ্ঠায় যেন লেখনী হঠাৎ উদভ্রান্ত হয়ে শীঘ্র শেষের দিকে ধাবিত হয়। ফলে ওর ছেলেকে নিয়ে গেল, তার মেয়েকে হারিয়ে ফেলল, ও চলে গেল, সে ভাবতে লাগল গোছের একাধিক ঘটনা অতি দ্রুত ঘটে যায়। এবং শেষাবধি ধর তক্তা মার পেরেক দশায় পরিণত হয়। যা সম্পূর্ণ উপন্যাসের লয় ও তাল ভঙ্গ করে।
উপন্যাসের শেষে বেশ কিছু ঘটনা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। হয়ত ওপেন এন্ড রেখে পরবর্তী খণ্ডের প্রত্যাশা তৈরি করাই উদ্দেশ্য। কিন্তু তাতে পাঠক কতটুকু আগ্রহ বোধ করবেন তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়ে যায়।
কাহিনীর ট্যাগ লাইন রূপে ব্যবহৃত রাজকুমারী ও কামারের আশ্চর্যজনক সাক্ষাৎকারকালে গহনারূপী অস্ত্র তৈরির যে রোমাঞ্চকর আদেশ দিয়ে কাহিনীর শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তীতে বিবরণের বিপুলতায় খেই হারিয়ে ছোট্ট একটি দুর্ঘটনা মাত্র হয়েই রয়ে যায়। তবে এই সাক্ষাৎকারের ফলাফল গল্পের এক বিশেষ স্থান অধিকার করে।
বইটি ভূমিকাহীন। এজন্য লেখিকা বা গল্পের উৎপত্তি সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া যায়না। বইয়ের শেষে লেখিকার সম্পর্কে যা জানানো হয়েছে তাও বড়ই ভাসা ভাসা। লেখিকা লিখিত অন্য কোনও বইয়ের নামও উল্লেখ করা হয়নি।
নামকরণের বিষয়ে কোথাও পরিষ্কার ধারণা দেওয়া হয়নি। অনেক খুঁজে পেলাম এর অর্থ আলোকপ্রাপ্ত মন। বইয়ের উৎসর্গে লেখা আছে - “শুভেচ্ছাসহ, সকল আলোর পথযাত্রীকে”। গল্পের শেষে চরিত্রদের আত্মার পরিশুদ্ধিকরণকেই আলোকপ্রাপ্তির সাথে তুলনা করা হয়েছে বলে ধরা যেতে পারে। সেই ক্ষেত্রে নামকরণ সুন্দর অর্থবহন করে। পাঠকও বিভিন্ন ভাবে সেই আলোককে স্পর্শ করে মুগ্ধ হন।
বইয়ের প্রচ্ছদ শিল্পী সুব্রত মাঝি। প্রচ্ছদ বেশ মনোরম। দেখে আকর্ষণ তৈরি করতে বাধ্য। দেশ পত্রিকায় প্রকাশকালে গল্পের সাথে কিছু অলংকরণও থাকত। যা অত্যন্ত সুন্দর ও প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে প্রাচীনকালের গল্পের ক্ষেত্রে আঁকা অলংকরণ বইয়ে আলাদা মাত্রা যোগ করে। কিন্তু বইয়ে একটিও অলংকরণ রাখা হয়নি। কারণ বুঝলাম না। রাখলে সত্যিই খুব সুন্দর হত বইপাঠ।
কিন্তু তবুও এই বই অন্তত একবার পড়তে হয়। কারণ লেখিকার লেখনীর গুণ। যদি এই উপন্যাস কেউ শুধুমাত্র গল্প কাহিনী না ভেবে পড়েন তাহলে নিরাশ হবেন না। সুন্দর, বাঙময়তা ফুটে উঠেছে লেখার মাধ্যমে। কিছু কিছু বর্ণনা এত সুন্দর যে পাঠক যেন সত্যিই সেই পরিস্থিতি পরিবেশকে অনুভব করতে পারবেন। কোনও কোনও সময় যেন মনে হবে সেই বরফ ঘেরা রহস্যময় পাহাড় বেষ্টিত উপত্যকায় দাঁড়িয়ে আছি। তথাগত বুদ্ধের আদর্শে অনুপ্রাণিত মঠের থেকে ধীর ও গম্ভীর লয়ে প্রার্থনা মন্ত্র ভেসে আসছে। শুদ্ধ করে দিচ্ছে শরীর ও আত্মা। এখানেই এই উপন্যাসের সফলতা। শুধুমাত্র লেখনীর গুণেই লেখিকা যেন তুলি বুলিয়ে এঁকে দিয়েছেন এক অজানা অচেনা জগতকে। যা অনুভব করা যায় আত্মার অন্তঃস্থল দিয়ে।
শুভেচ্ছা রইল সকলের জন্য।
রিভিউটি লিখেছেনঃ Sanjhbati
আপনিও লিখতে পারেন রিভিউ। বিস্তারিত দেখুন এখানে।
Posted By:
boibd
অসচরাচর - মাশুদুল হক Osochorachor - Mashudul Haque
অসচরাচর - মাশুদুল হক Osochorachor : Mashudul Haque
বই- অসচরাচর
লেখক- মাশুদুল হক
জনরা- থ্রিলার, অতিপ্রাকৃত
প্রচ্ছদ- আদিব রেজা রঙ্গন
প্রকাশনী- চিরকুট
প্রথম প্রকাশ- ফেব্রুয়ারি, ২০২৪
পৃষ্ঠা সংখ্যা- ১১২
মুদ্রিত মূল্য- ২৪০ /-
রেটিং - ৪/৫
"অসচরাচর নাজুক মানসিক অবস্থার একজন তরুণ ডাক্তারের গল্প, রোগী দেখতে গিয়ে যিনি কিছু বিচিত্র বিপজ্জনক আর অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান, যেসবের হয়তো কোন ব্যাখ্যা নেই বা সেসব ব্যাখ্যার জন্য আমরা প্রস্তুত নই।"
অসচরাচর ৫ টি আধিভৌতিক বা ব্যাখ্যাতীত মেডিক্যাল কেসের সমন্বয়ে তৈরি একটি গল্পগ্রন্থ। প্রতিটি গল্প একজন ডাক্তারের 'অসচরাচর' কিছু কেস স্টাডি নিয়ে। মাশুদুল হকের লেখনী প্রশংসার দাবিদার। প্রতিটি গল্পই ভয়ঙ্কর ভয়ানক না হলেও অস্বস্তিকর অনুভূতির উদ্রেক ঘটাতে সক্ষম।
ব্যক্তিগত ভাবে শেষ গল্প "আন্না" ব্যতীত প্রতিটি গল্পই বেশ চমকপ্রদ লেগেছে আমার কাছে। ৫ টি গল্পের ভিতর আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে 'হোস্ট' এবং 'ইয়ানোমামিয়ান'। তবে ইয়ানোমামিয়ান এর শেষ মোচড় সবাই হজম করতে নাও পারে। লেখকের কাছে আশা থাকবে আরো কিছু অসচরাচর গল্পের। এককথায় বইটি আমার কাছে ভয়ঙ্কর সুন্দর লেগেছে। মেডিক্যাল হরর বা গল্পগ্রন্থের পাঠকদের জন্য অবশ্য পাঠ্য।
প্রচ্ছদের জন্য আদিব রেজা রঙ্গন সত্যিই আলাদা ভাবে প্রশংসার দাবি রাখেন।
রিভিউটি লিখেছেনঃ শাদমান সৌমিক।
আপনিও লিখতে পারেন রিভিউ। বিস্তারিত দেখুন এখানে।
Subscribe to:
Posts (Atom)